
দেশজুড়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে আগামী তিন থেকে চার বছরে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করে চিকিৎসাব্যবস্থাকে ‘ট্রিটমেন্ট সেন্ট্রিক’ ধারা থেকে ‘প্রিভেনশন সেন্ট্রিক’ বা প্রতিরোধভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে তোলা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং মা ও নবজাতকের সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রোববার (২১ জুন) সচিবালয়ে পুরাতন ১ নং ভবনের সভাকক্ষে স্বাস্থ্যখাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী বলেন, চলতি মাসে পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইফসের ৩৪তম আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ১২২টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই সম্মেলনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেন তিনি।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শুধু রোগের চিকিৎসানির্ভর না রেখে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট এবং প্রতিটি শহুরে ওয়ার্ডে একই ধরনের ইউনিট গড়ে তোলা হবে। এসব কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা থাকবে এবং অন্তত দুজন করে মিডওয়াইফ দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি জানান, বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। সেখানে জটিল প্রসব ও নবজাতকের নিবিড় সেবাসহ পূর্ণাঙ্গ মাতৃসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে রোগীদের উচ্চতর কেন্দ্রে যেতে না হয়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী বলেন, বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার মিডওয়াইফ রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে আগামী এক বছরের মধ্যেই মোট লক্ষ্যমাত্রার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মিডওয়াইফ নিয়োগের চেষ্টা করা হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের সিএইচসিপিদের সমন্বয় করে একক কাঠামোয় আনা হবে। নতুন এ কাঠামোর কর্মীদের ‘কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার’ নামে পরিচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার প্রতিটি পরিবারের কাছে গিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ পৌঁছে দেবেন।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪১ থেকে ৪২ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। নতুন এক লাখ কর্মী যুক্ত হলে মোট সংখ্যা প্রায় দেড় লাখে পৌঁছাবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো বাতিল করা হবে না। বরং বৃহত্তর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ‘স্বাস্থ্য হাব’-এ রূপান্তর করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিটের অধীনে তিনটি করে স্বাস্থ্য হাব থাকবে এবং সেখানে তিন থেকে চারজন করে কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার কাজ করবেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে খুলনা, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নোয়াখালী—এই পাঁচ জেলায় পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে। সেখানে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা ও রেফারেল ব্যবস্থাও পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে।
প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান ড. জিয়াউদ্দিন। তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। প্রয়োজন হলে রোগীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা হবে, ফলে দালালচক্র ও অযথা হয়রানি কমবে।