জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব চায়’ যুক্তরাষ্ট্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

ফানাম নিউজ
  ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩০

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের ভোটের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে ভালো ফল’ করতে পারে বলে ধারণা করছেন ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিকরা। ভোট ঘিরে তাদের এ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ‘বন্ধুত্বের পথে’ হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ বিষয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের একটি রেকর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি এক সময়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া দলটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের যোগাযোগ বাড়ানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে।

ক্ষমতায় যেতে পারলে জামায়াত যদি বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক কিছু চাপিয়ে দেয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয় এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় তাহলে দেশটি কী ব্যবস্থা নেবে সেসবও কূটনীতিকরা ভেবে রেখেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাতে ওয়াশিংটন পোস্টের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঢাকার নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের এক বৈঠকের তথ্যে এ খবর দেয় ওয়াশিংটন পোস্ট। গত ১ ডিসেম্বর হওয়া গোপন সেই বৈঠকের অডিও হাতে পাওয়ার কথা লিখেছে ‍সংবাদমাধ্যমটি।

ওয়াশিংটন পোস্টের নয়া দিল্লির ব্যুরো প্রধান প্রানশু ভার্মার করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী বেশ কয়েকবারই নিষিদ্ধ হয়েছে। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছে। প্রথাগতভাবে তারা শরিয়া আইনে দেশ পরিচালনা ও সন্তানদের জন্য নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার কথা বলে আসছে। যদিও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি তাদের ভাবমূর্তি উদার করছে। দুর্নীতি নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে দলের সমর্থন জোরালো করছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা ‘পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি আন্দোলন’ বা ‘নবোদ্যমে’ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ঢাকায় এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, দেশ ‘ইসলামি ধারায় ফিরেছে’। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসের সব থেকে ভালো ফল করতে পারে।

“আমরা তাদের (জামায়াত ইসলামী) বন্ধু হিসেবে চাই,” বলেন সেই মার্কিন কূটনীতিক।

পরে তিনি বৈঠকে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, তারা জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের (ছাত্রশিবির) টকশো বা প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানাতে ইচ্ছাপোষণ করেন কিনা।

ওই কূটনীতিক সাংবাদিকের বলেন, “আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের শো-তে যাবে?”

‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে সেই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ না করার কথা লিখেছে ওয়াশিংট পোস্ট।

জামায়াতে ইসলামী শরিয়া আইনের ব্যাখ্যা ‘চাপিয়ে দিতে পারে’- এমন ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না এ কূটনীতিক। তবে তিনি বলছেন, ওয়াশিংটনের হাতে ‘প্রভাব খাটানোর মত’ এমন কিছু আছে, যা প্রয়োজনে তারা ব্যবহারের জন্যও প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “সহজ কথায়, আমি মনে করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দেবে। আর যদি দলটির নেতারা উদ্বিগ্ন হওয়ার মত পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে।”

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া বিবৃতিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, “ডিসেম্বরের মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল।

“তখন অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই বেছে নিক, তার সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।”

এ ব্যাপারে জামায়াতের ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “গোপন কূটনৈতিক বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।”

এ প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এগুলো তো একটি পত্রিকা ও তাদের একজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ। দেশের পরিস্থিতি একটি প্রতিবেদনে কার্যত উঠে আসে না।

“সামনে জাতীয় নির্বাচন, আমাদের মাঝ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, সংস্কার হয়েছে, বিচারের কার্যক্রম চলছে, সব মিলিয়ে অনেকেই এ ধরনের প্রতিবেদন করেছে। আল জাজিরাও করেছে, তাদের প্রতিবেদনেও চোখ বুলিয়েছি। কিন্তু দিনশেষে মানুষের অবস্থানই মূল।”

প্রতিবেদনের প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বিষয়টি পুরো দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।

‘মূলধারায়’ প্রবেশ করছে জামায়াত?

অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক, বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুবাশার হাসান মনে করেন, শেখ হাসিনার আমলে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ থাকার পর জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনি প্রচারে ব্যাপক গতি পেয়েছে। তারা ‘মূলধারার রাজনীতিতে চলে এসেছে’।”

জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্ল্যাটফর্ম’ নিয়ে কাজ করছেন। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে। শরিয়া আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।”

রাজনীতিতে বিএনপির কৌশল নিয়ে নাম প্রকাশ না করে এক ব্যক্তি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিএনপি জয় পেলে দেড় যুগ নির্বাসনে থেকে দেশে ফেরা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি (তারেক রহমান) বিশ্বাস করেন, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ধারণার চেয়েও ভালো ফল করবে। তবে এর জন্য তিনি জামায়াতের সঙ্গে জোট সরকার করবেন না।”

তবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তিনি বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

চলতি মাসে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “যদি দলগুলো একত্র হয়, তবে আমরা একসঙ্গে সরকার চালাব।”

মোহাম্মদ রহমান বলেন, হাসিনা সরকারের পতনের পর জামায়াত ইসলামী ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি বৈঠক করেছেন। ঢাকাতেও কিছু বৈঠক হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে।

ওয়াশিংটনে হওয়া বৈঠকগুলোর ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠকগুলোকে ‘কূটনৈতিক রুটিন কাজ’ বলছে তারা। ওয়াশিংটন পোস্টের অনুরোধে ‘ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ’ও (ইউএসটিআর) কোনো মন্তব্য করেনি।

নাম প্রকাশ না করা সেই মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মত ইসলামপন্তি দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন দূতাবাসের কর্মীরা।

ওই কূটনীতিক বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক...।”

তবে তিনি এও জোর দিয়ে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় আসে এবং এমন কিছু করে যা ওয়াশিংটনের কাছে চরম অপছন্দের, তবে বিশাল তৈরি পোশাকশিল্পে এর জবাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

“বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ২০ শতাংশ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সামাজিকভাবে উদার পোশাক সরবরাহ ব্যবস্থা ও একগুচ্ছ পোশাক ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতি। যদি নারীদের বলা হয় তারা কেবল পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে, অথবা তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং শরিয়া আইন জারি করে, তবে আর কোনো অর্ডার যুক্তরাষ্ট্রে যাবে না। আর যদি কোনো অর্ডার না আসে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির অস্তিত্বই থাকবে না।”

তবে জামায়াতে ইসলামী সেটি করবে না বলেই মনে করেন সেই মার্কিন কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, “তাদের (জামায়াতে ইসলামী) বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ রয়েছে। দলটির কর্মকাণ্ডের ফলে কী ঘটতে পারে, সেটি আমরা তাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।”

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়