নাইকো ও বাংলাদেশ: দুই দশকের লড়াই, একটি রাষ্ট্রীয় জয়

ফানাম নিউজ
  ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৯

প্রায় দুই দশক পর টেংরাটিলার আগুন নিভেছে—অন্তত আইনের কাগজে। ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেডকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল আইসিএসআইডি। বর্তমান বিনিময় হারে যা ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। এই রায় শুধু একটি আর্থিক ক্ষতিপূরণের ঘোষণা নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৯ সালে। দীর্ঘদিন উৎপাদনের পর কূপে পানি উঠে আসায় একপর্যায়ে তা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে নতুন করে অনুসন্ধান ও উন্নয়নের আশায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ক্ষেত্রটির দায়িত্ব দেওয়া হয় কানাডাভিত্তিক নাইকো রিসোর্সেসকে। কিন্তু সেই ‘উন্নয়ন’ অচিরেই রূপ নেয় জাতীয় বিপর্যয়ে।

২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন—দুই দফা ভয়াবহ বিস্ফোরণে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি ও পরিবেশ। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কূপে চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড উপেক্ষাই ছিল এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।

দায় অস্বীকার থেকে আইনি লড়াই

দুর্ঘটনার পর পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও কোম্পানিটি তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শুরু হয় দেশীয় আদালতে মামলা, সম্পদ জব্দ, চুক্তি বাতিল এবং শেষে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়া। ২০১০ সালে নাইকো নিজেই আইসিএসআইডিতে মামলা করে—একদিকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বিল আটকে রাখার অভিযোগে, অন্যদিকে টেংরাটিলা বিস্ফোরণে ক্ষতিপূরণ দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে।

এই আইনি লড়াই ছিল দীর্ঘ, জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। ২০১৪ সালে এক রায়ে বাংলাদেশকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বিল পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হলেও, টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ বিষয়ে নাইকোর আপত্তি একে একে খারিজ হতে থাকে। অবশেষে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পাল্টা মামলা করে প্রায় ১১৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবিতে। তারই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো সাম্প্রতিক এই রায়ে।

কী বলেছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল

আইসিএসআইডি স্পষ্টভাবে বলেছে—নাইকো আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের স্বীকৃত নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেনি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানে গুরুতর ঘাটতির কারণেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। ফলে আইনি ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই নাইকো দায়ী।

ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে দুই খাতে:

প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার জন্য ৪ কোটি ডলার

পরিবেশগত ক্ষতি ও অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য অতিরিক্ত ২০ লাখ ডলার

পরিবেশগত ক্ষতির স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

রাজনীতি, দুর্নীতি মামলা ও ভিন্ন বাস্তবতা

নাইকো ইস্যু শুধু জ্বালানি বা আইনি প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০০৭ সালে দুদক অভিযোগ তোলে যে, অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। সেই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ একাধিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি অভিযুক্ত হন।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবাই খালাস পান। এই খালাস রাজনীতির মাঠে নতুন বিতর্ক তৈরি করলেও, আন্তর্জাতিক সালিশি রায়ে নাইকোর দায় প্রমাণিত হওয়া একটি আলাদা বাস্তবতা সামনে আনে: চুক্তির রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ এক বিষয়, আর শিল্প দুর্ঘটনায় করপোরেট অবহেলা প্রমাণ আরেক বিষয়।

ভবিষ্যৎ বার্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেখানে এখনো দুই থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে নতুন কূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তবে এই রায়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য অন্য জায়গায়। এটি প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশ কেবল দেশীয় আদালতেই নয়, আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা: বাংলাদেশে বিনিয়োগ মানে দায়িত্বহীনতা নয়; নিরাপত্তা মানদণ্ড, পরিবেশ রক্ষা এবং আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য অপরিহার্য।

টেংরাটিলার আগুন হয়তো বহু আগেই নিভে গেছে, কিন্তু তার উত্তাপ এতদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্মৃতিতে জ্বলছিল। আইসিএসআইডির এই রায় সেই আগুনকে ইতিহাসে পরিণত করেছে—একটি তিক্ত, কিন্তু শিক্ষণীয় ইতিহাস।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়