
সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করার পরও বায়ুদূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আজ রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারের বায়ুমান সূচক (আইকিউ) দাঁড়ায় ৫৩৭-এ, যা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ স্তরের অনেক ওপরে। বায়ুমানের মান ৩০০ ছাড়ালে সেটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্যোগপূর্ণ ধরা হয়।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী, একই সময়ে বিশ্বের ১২১টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। রাজধানীর বায়ুমান ছিল ২২০, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। তবে ঢাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দূষণ রেকর্ড করা হয় সাভারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন অস্বাভাবিক মাত্রার দূষণ নজিরবিহীন।
গত বছর বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। কোনো এলাকায় বায়ুমান নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে মারাত্মক দূষিত হলে তাকে এভাবে ঘোষণা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ঘোষণার পর সাভারে কিছু কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এর মধ্যে ছিল—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ছাড়া সব ধরনের ইটভাটায় ইট পোড়ানো ও উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ, উন্মুক্ত স্থানে কঠিন বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ এবং দূষণ সৃষ্টি করতে পারে এমন নতুন শিল্পকারখানার জন্য অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না দেওয়া।
তবে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, ঘোষণাটি ছিল কার্যত ‘আলঙ্কারিক’। তিনি বলেন, শুধু ঘোষণা দিয়ে গণমাধ্যমে প্রচার করলেই বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না। কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি থাকায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সাভার উপজেলায় মোট ১০৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে (অক্টোবর-মার্চ) উত্তর দিক থেকে বায়ুপ্রবাহ দক্ষিণে আসে। ফলে সাভারের দূষিত বায়ু ঢাকায় প্রবেশ করে রাজধানীর দূষণও বাড়িয়ে তোলে। এ কারণেই সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানানো হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ঘোষণার পরপরই অনেক ইটভাটা বন্ধ হয়েছিল। তবে আদালতের আদেশে ৪০ থেকে ৪৫টি ইটভাটা পুনরায় চালু হয়। তিনি স্বীকার করেন, সব ইটভাটা বন্ধ রাখা সম্ভব হয়নি এবং উন্মুক্ত বর্জ্য পোড়ানোও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
এদিকে রাজধানীর পাঁচ এলাকাতেও আজ ভয়াবহ দূষণ লক্ষ্য করা গেছে। সর্বোচ্চ দূষণ ছিল নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেডসংলগ্ন এলাকায় (২৮৩)। এছাড়া সাগুফতা (২৬৫), দক্ষিণ পল্লবী (২৫০), গুলশানের বে’জ এইজ ওয়াটার (২৩৫) এবং বেচারাম দেউড়ী (১৯১) এলাকাতেও উচ্চমাত্রার দূষণ রেকর্ড করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান কার্যক্রমগুলো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক এবং সেগুলোরও কার্যকারিতা সীমিত। ফলে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন এলাকায় দূষণের মাত্রা এখন অনেক ক্ষেত্রে ঢাকার চেয়েও বেশি দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল ঘোষণায় নয়—কার্যকর নজরদারি, কঠোর বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সাভার কিংবা ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব নয়।