
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি নিখোঁজ হওয়ার আগে তার সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন ‘জুনিয়র বন্ধু’ দ্বীপ। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাহসিফের বাসায় যান তিনি। রাত ১২টার কিছু আগে-পরে বাসার নিচে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেন তারা। এ সময় দুজনে মিলে মোটরসাইকেল মেরামত করান এবং একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা পোস্টকে এসব কথা জানান দ্বীপ। তিনি বলেন, ‘তাহসিফ ভাই বয়সে আমার চেয়ে ২-৩ বছরের সিনিয়র হলেও আমরা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনের মোটরসাইকেলের মডেল একই। বাইকে সমস্যা দেখা দেওয়ায় কীভাবে ঠিক করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ নিতে আমাকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প এলাকার বাসায় ডেকেছিলেন। আমি গিয়ে তাকে বিষয়টি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিই।’
দ্বীপ জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তারা একটি ওয়ার্কশপে গিয়ে মোটরসাইকেল ঠিক করেন। এরপর এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে তাহসিফকে বাসার নিচে রেখে নিজের বাসা মোহাম্মদপুরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
তাহসিফের বাবা অবশ্য জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দ্বীপের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি তার ছেলে।
রাত ১২টা পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার কথা জানালেও তাহসিফের মৃত্যুর বিষয়ে বিশেষ কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলে দাবি করেন দ্বীপ। তাহসিফের ময়নাতদন্তের সময় তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ভবনের নিচের গ্যারেজে এক ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলান তাহসিফ। এরপর তারা পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। নিহতের পরিবার ওই ব্যক্তিকে দ্বীপ হিসেবে শনাক্ত করেছে।
পরিবারের দাবি, দ্বীপের ডাকেই সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। মাকে বলেছিলেন, নিচে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ফিরবেন। কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ছেলেকে হত্যার সন্দেহ বাবার
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মনে করছেন না। তার সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ সারাদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিলেন এবং মা-বাবার জন্য কেনাকাটা করেছেন। সন্ধ্যার দিকে দ্বীপ তাকে ডাকতে এলে মাকে বলে নিচে যান তাহসিফ।
এরপর বারবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পরে রাত ১টার পর তাহসিফ মাকে বার্তা দিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ছেলের কোনো শত্রু ছিল না জানিয়ে তাহসিফের বাবা বলেন, তার ছেলে অত্যন্ত ভদ্র ও সামাজিক ছিলেন। বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার কারণে কিছুটা খারাপ লাগা থাকলেও তা নিয়ে বড় কোনো সমস্যা ছিল না।
বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাহসিফকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তিনি উড্ডয়নেও দক্ষ ছিলেন। তাই তার পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস বাবার।
মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, দাফন ও জানাজার কাজ শেষ করার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই এলাকায় তাহসিফ কখনো যেতেন না। সেখানে কীভাবে তার মরদেহ গেল, তা বোধগম্য নয়।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে ভাসমান মরদেহটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এর আগে তাহসিফের বাবা তুরাগ থানায় খোঁজ নিলে পুলিশ প্রথমে তথ্য দিতে পারেনি। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
বৃহস্পতিবার সকালে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুস্তাফিজুর রহমান সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। নিহতের খালাতো ভাই জহির হাসান মরদেহ শনাক্ত করেন।
সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল এবং পেট ফোলা ছিল। বুক, পিঠ ও দুই পা স্বাভাবিক ছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর বিকেলে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন।
বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাহসিফ সৌরিকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঢাকা জেলা নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।