
বাংলাদেশে বিএনপি চেয়ারপারসনের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এই স্বল্প সময়ে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে নানা আলোচনা ও মূল্যায়ন। কেউ দেখছেন আশার আলো, আবার কেউ তুলছেন প্রশ্ন—পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একশ দিনের পরিকল্পনার পরিবর্তে এবার একশ আশি দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নের ইঙ্গিত বহন করে।
এরই মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ মওকুফ এবং কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ ছাড়া সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও সরকারের উন্নয়ন ভাবনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে সহায়ক হলেও অর্থনীতিতে গতি আনতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই।
তবে ইতিবাচক পদক্ষেপের পাশাপাশি সমালোচনাও কম নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগ—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকেও অনেকে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজি রোধে সরকারের সাফল্য নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নির্বাচনের আগে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলো কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—সেই প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নানা ইস্যু সামনে এসেছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরির চেষ্টা লক্ষ করা গেলেও কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের প্রত্যাহারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পেশাদারিত্ব নিয়ে।
অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সংস্কার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সংসদের মাধ্যমেই পরিবর্তন আনা হবে—এমন ইঙ্গিত মিললেও সময়সীমা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বিরোধী রাজনীতি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, এক মাসে সরকার কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু করলেও সমালোচনা ও বিতর্কও সমানতালে রয়েছে। ফলে এই সরকার শেষ পর্যন্ত নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, নাকি পুরোনো ধারাতেই চলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা