
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সরকার সারা দেশে যান চলাচলে একাধিক বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। উদ্দেশ্য—আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং ভোটের পরিবেশ নিরাপদ রাখা। কিন্তু সেই প্রজ্ঞাপনেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় স্পষ্ট নয়, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কীভাবে?
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্রাক চলাচল বন্ধের কথা বলা হলেও সিটি, লোকাল কিংবা দূরপাল্লার বাস চলাচল নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এর ফলে ভোটের আগমুহূর্তে সাধারণ মানুষ, পরিবহন মালিক ও চালক—সবার মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিধি-নিষেধ আছে, ব্যাখ্যা নেই
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু যান চলাচল বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জরুরি সেবা ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত যানবাহনের জন্য ছাড় রাখা হয়েছে, তবু সাধারণ ভোটারের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান ভরসা—গণপরিবহন নিয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
এমনকি পরিবহন খাতের শীর্ষ সংগঠনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না ভোটের দিন বাস চলবে কি না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, লিখিত নির্দেশনা না পেলেও ‘শোনা যাচ্ছে’ বাস বন্ধ থাকতে পারে। এই ‘শোনা যাচ্ছে’-নির্ভর বাস্তবতা একটি জাতীয় নির্বাচনের জন্য মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়।
এই অস্পষ্টতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ ভোটাররা। রাজধানীর ভাটারায় বসবাসকারী সৌরভ আহমেদের মতো বহু মানুষ এখনো জানেন না, ভোটের দিন তারা কীভাবে নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে যাবেন। লোকাল বাস বন্ধ থাকলে, সিএনজি বা ছোট গাড়ি চলাচলেও যদি নিষেধাজ্ঞা থাকে—তাহলে বাস্তবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।
ভোটাধিকার কেবল ব্যালটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেখানে যদি পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকে, তাহলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন হলেও তা যেন ভোটারদের চলাচলের পথে বাধা না হয়। বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান যথার্থই বলেছেন, গণপরিবহন নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে ভোটারদের বিভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। নিরাপত্তা আর অংশগ্রহণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সমন্বয়হীনতার চিত্র
এই পরিস্থিতি মূলত সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন। একদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে পরিবহন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় স্পষ্ট অবস্থান জানাতে পারছে না। এমনকি মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তারাও নিশ্চিত নন, গণপরিবহন নিয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কি না।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দরকার এখনই
ভোটের আর হাতে গোনা কয়েক দিন বাকি। এই সময়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলো হলো—
ভোটের দিন সিটি ও লোকাল বাস চলবে কি না?
আন্তজেলা বাস সার্ভিস চালু থাকবে কি?
ভোটারদের জন্য কোনো বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও একক উত্তর না এলে ভোটারদের আস্থাহীনতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকেই দুর্বল করতে পারে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন মানেই কেবল নিরাপত্তা নয়—নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আসল পরীক্ষা।