
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সংখ্যার বিচারে, অংশগ্রহণের পরিধিতে এবং প্রক্রিয়াগত নতুনত্বে—এবারের নির্বাচন ইতোমধ্যেই রেকর্ড গড়েছে। প্রশ্ন এখন একটাই: এই নির্বাচন কি কেবল সংখ্যার রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা করবে?
এবার ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ২০২৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটাররা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন ১১৯টি প্রতীকের মধ্যে থেকে—যা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে যেখানে ২৮টি দল ও ৬৯টি প্রতীক ছিল, সেখানে এবার প্রায় দ্বিগুণ বিস্তৃতি।
সংখ্যার এই বৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক সম্প্রসারিত চিত্র। ছোট ও মাঝারি দলগুলোর উপস্থিতি, নতুন প্রতীকের অন্তর্ভুক্তি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে ভোটের মাঠ হয়েছে বহুমাত্রিক।
তার ওপর একটি সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ যুক্ত হওয়া নির্বাচনী কাঠামোয় নতুন মাত্রা এনেছে। এতে ভোট কেবল প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; নীতিগত অবস্থানও প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি অংশ নিচ্ছে না। আরও আটটি নিবন্ধিত দল প্রার্থী দেয়নি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে—যদিও শরিক দলের কিছু প্রার্থীর নাম তালিকায় রয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততার চিত্র প্রকাশ করে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরিত্রকে প্রভাবিত করে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন আংশিক বর্জনের কারণে বিতর্কিত ছিল। ফলে এবারের নির্বাচনেও অংশগ্রহণের পরিসর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফ্যাসিবাদের পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবও তেমন একটা মাঠে কাজ করছে না বললেই চলে।
বড় দলগুলোর অবস্থান ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র
বিএনপি ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে লড়াইয়ে আছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে। পাশাপাশি গণ অধিকার পরিষদ, সিপিবি, বাসদ, এবি পার্টি, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভোটের মাঠে সক্রিয়।
এতে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনটি একক শক্তির প্রাধান্যের চেয়ে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো—এই বিস্তৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি বাস্তব ভোটের লড়াইয়ে সমান শক্তিতে রূপ নেবে, নাকি শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বড় দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
কোথায় দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচন
১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন, ১৯৯৬ সালের দ্বৈত নির্বাচন, ২০০৮ সালের উচ্চ ভোটার উপস্থিতি, কিংবা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্ক—প্রতিটি নির্বাচনই ছিল রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ছয় মাস সাত দিন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, সরকারের পতন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বর্তমান নির্বাচন—এই প্রেক্ষাপট ত্রয়োদশ নির্বাচনকে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার বাইরে এনে এক ধরনের ‘ট্রানজিশন নির্বাচন’-এ পরিণত করেছে।
অর্থাৎ, এটি কেবল নিয়মিত সাংবিধানিক নির্বাচন নয়; বরং একটি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ।
ভোটার উপস্থিতি
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৯৬ (সপ্তম), ২০০১ (অষ্টম) ও ২০০৮ (নবম) সংসদ নির্বাচনে উচ্চ ভোটার উপস্থিতি রাজনৈতিক বৈধতার শক্ত ভিত তৈরি করেছিল। বিপরীতে, অংশগ্রহণ কমে গেলে বা বড় দল অনুপস্থিত থাকলে সেই বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ত্রয়োদশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ভোটার উপস্থিতি, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা। রেকর্ড সংখ্যক প্রার্থী ও প্রতীক থাকলেও শেষ পর্যন্ত জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই নির্ধারণ করবে নির্বাচনের শক্তি।
নতুন সমীকরণ নাকি পুরোনো ধারার পুনরাবৃত্তি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন তিনটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ—
১. বিস্তৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২. সংস্কার প্রস্তাব যুক্ত হওয়া
৩. রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম বড় নির্বাচন
তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—এই নির্বাচন কি নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক পেশি শক্তির সংস্কৃতিতেই আটকে থেকে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংখ্যার বিচারে রেকর্ড, কাঠামোগত দিক থেকে নতুন, আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবেদনশীল। এটি একদিকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সম্প্রসারণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য সূচনা।
সব চোখ এখন ভোটের ফলাফলের দিকে। ফল শুধু সরকার গঠনের সমীকরণই নির্ধারণ করবে না—বরং ঠিক করে দেবে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে এগোবে তার ক্রসলাইন।