
ধর্ম ডেস্ক
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বাংলাদেশে ধর্মীয় আবহে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ১২ রবিউল আউয়ালকে ঘিরে প্রতিবছরই মুসলমানদের মধ্যে একটি প্রশ্ন দেখা যায়—এ দিনে বিশেষ কোনো নামাজ, রোজা বা নির্দিষ্ট আমল করার বিধান আছে কি না?
কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত, বিশেষ নামাজ কিংবা নির্ধারিত সংখ্যায় জিকির-দরুদ পাঠের বিধান নেই। তবে আল্লাহর ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, দান-সদকা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মতো নেক আমল যেকোনো সময়ই করা যায়।
নবীজির আদর্শ অনুসরণই ভালোবাসার প্রমাণ
মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম প্রধান প্রকাশ হলো তার সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করা। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের জন্য রাসুলের অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। তাই নবীজির প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত।
বেশি বেশি দরুদ ও সালাম
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের প্রতি কোরআনেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং মুমিনদেরও তার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন। তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা যেতে পারে। তবে এ দিনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতি শরিয়তে নির্ধারিত হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।
সিরাত পাঠ ও নবীজির জীবন জানা
রবিউল আউয়াল মাস মহানবী (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ সম্পর্কে জানার একটি সুযোগ হতে পারে। এ সময় তার সিরাত পাঠ, পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের কাছে তার জীবন ও শিক্ষা তুলে ধরা এবং সেই আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করা যেতে পারে।
মানুষের সঙ্গে সদাচরণ, ন্যায়বিচার, ক্ষমাশীলতা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং মানবিক আচরণের মতো মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাগুলো বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই তার প্রতি ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া
কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, জিকির ও দোয়া সব সময়ের নেক আমল। ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনও এসব আমল করা যেতে পারে। নিজের ও পরিবারের হেদায়াত, দেশ ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং মানুষের কল্যাণের জন্য দোয়া করা যেতে পারে।
তবে ‘মিলাদুন্নবীর বিশেষ দোয়া’ নামে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া কোরআন বা সহিহ হাদিসে রয়েছে—এমন দাবি করার আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা জরুরি।
দান-সদকা ও খাবার বিতরণ
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দান-সদকা করা এবং ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো ইসলামে প্রশংসনীয় কাজ। তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর উপলক্ষে সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্রদের সহায়তা করা বা খাবার বিতরণ করা যেতে পারে।
তবে এসব মানবিক ও নেক কাজ শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর চালিয়ে যাওয়াই উত্তম।
১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষ রোজা?
মহানবী (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে সোমবারের রোজার সম্পর্ক নিয়ে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস রয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবার রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, এ দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এ দিনই তার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।
তবে এই হাদিসে প্রতি সোমবার নফল রোজার কথা বলা হয়েছে। ১২ রবিউল আউয়ালে প্রতিবছর বিশেষভাবে রোজা রাখার আলাদা বিধান হিসেবে এটিকে গ্রহণ করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ বছর বাংলাদেশে ১২ রবিউল আউয়াল পড়েছে বুধবার, ২৬ আগস্ট। তাই সোমবারের রোজা সম্পর্কিত হাদিসকে সরাসরি ১২ রবিউল আউয়ালের নির্দিষ্ট রোজার দলিল হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কেউ চাইলে সাধারণ নফল রোজা হিসেবে রোজা রাখতে পারেন।
মিলাদ উদ্যাপন নিয়ে আলেমদের মতভেদ
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করা নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
মিসরের দারুল ইফতাসহ কিছু আলেমের মতে, শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দরুদ পাঠ, মহানবী (সা.)-এর জীবন আলোচনা এবং দরিদ্রদের খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে নবীজির জন্মস্মরণ করা বৈধ।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবন বাযসহ একদল আলেমের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনের যুগে ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বার্ষিক আয়োজনের প্রচলন ছিল না। তাই এটিকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
অর্থাৎ, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসা, তার সুন্নাহ অনুসরণ এবং তার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
এই দিনে কী করা যেতে পারে?
ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন একজন মুসলমান তার ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম, জিকির, ইস্তিগফার, দোয়া, সিরাত পাঠ এবং দান-সদকার মতো নেক আমল করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহানবী (সা.)-এর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, মানবিকতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
কারণ নবীজির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় নয়; বরং তার দেখানো পথে প্রতিদিনের জীবন পরিচালনার মধ্যেই সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।