বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্নে
দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ, আস্থার সংকট ও ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতির কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৬৭২ কোটি টাকা। এক বছর আগে এ অঙ্ক ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। সে হিসাবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ছিল। জানুয়ারিতেও প্রবৃদ্ধি একই ছিল। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। ওই বছরের এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। পরের মাস মে’ তে তা কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে। এরপর জুনে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জুলাইয়ে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, আগস্টে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, অক্টোবরে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি ঋণের এ ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান, আমদানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় অংশই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ পরিবেশে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের চাপে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতাও ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমলেও সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বড় অংশের তহবিল সরকারি ঋণে চলে যাচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত করছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও একক গ্রাহকের ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নেও ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।
এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম পুনর্গঠনে দেওয়া নীতিসহায়তার সময়সীমাও বাড়ানো হয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এ সুবিধার জন্য আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি বন্ধ কারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কাজ করছে।