
কয়েকদিন ধরে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গোলাগুলি চলছে। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যকার এ সংঘর্ষের ফলে সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় গুলি ও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। আর এসব ঘটনায় সীমান্তবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিনভর কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামলেই উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। শিশুদের বাইরে বের হতে দিতেও ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সালেহ বিপ্লব নামে টেকনাফ উপজেলার এক বাসিন্দা বলেন, রাত হলেই আতঙ্ক বেড়ে যায়। শিশুদের বাইরে বের হতে দিতেও ভয় লাগে। সীমান্তে স্থায়ী শান্তি না এলে আমাদের এই ভয়ের জীবন শেষ হবে না।
তাঁর মতো অনেক সীমান্তবাসী একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফের এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিটি এসে লাগে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বাসিন্দা শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনানের মাথায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে।
গুলিবিদ্ধ শিশুর চাচা আলী আকবর বলেন, আমার ভাতিজির কোনো অপরাধ ছিল না। সীমান্তের সংঘাতের শিকার হয়ে সে আজ জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমরা চাই, সীমান্ত এলাকায় আর কোনো নিরীহ শিশু এভাবে গুলিবিদ্ধ না হোক।
এর একদিন পর সোমবার (১২ জানুয়ারি) হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় মাটির নিচে পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামের এক যুবক গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার ডান পায়ের গোড়ালি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাম পায়েও মারাত্মক আঘাত লাগে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আহত যুবকের বাবা ফজলুল হক বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় চলাচল করাই এখন জীবনের ঝুঁকি। কোথায় কোথায় মাইন পুঁতে রাখা আছে, তা আমরা জানি না। এ অবস্থায় মানুষ কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে?’
পরপর এসব ঘটনায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো টেকনাফ সীমান্তজুড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে গত দুদিন ধরে হোয়াইক্যংসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, মাইন অপসারণ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল জানান, গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘এখনো সীমান্তের কাছাকাছি বেড়িবাঁধ সংলগ্ন চিংড়ি ঘেরগুলোতে যেতে স্থানীয়রা ভয় পাচ্ছেন।’
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, গুলিবিদ্ধ শিশু ও মাইন বিস্ফোরণে আহত যুবকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পরিবারের কাছে চেক হস্তান্তরের আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্ক না ছড়াতে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
সীমান্তে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এ আতঙ্ক কাটবে না—এমনটাই মনে করছেন টেকনাফের সাধারণ মানুষ।